শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

নির্বাচন কমিশন প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ

রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল হামিদ নতুন একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, আগামী ১৮ ডিসেম্বর তিনি প্রথম বৈঠক করবেন বিএনপির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য দলগুলোর সঙ্গে তার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রকাশিত প্রাথমিক তালিকায় আওয়ামী লীগের নাম না থাকায় প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হলেও সাধারণভাবে রাষ্ট্রপতির এই উদ্যোগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট ও অচলাবস্থা কটিয়ে ওঠার ব্যাপারেও আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে আপত্তি উঠেছে অনেক আগে থেকে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে এই কমিশনকে বাতিল করে প্রধান ও জনসমর্থিত দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নতুন ইসি গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে দাবি জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা জনগণের দাবি ও প্রত্যাশার পরিপন্থী অবস্থান নিয়েছেন। অনেকাংশে সিদ্ধান্তের আকারে তারা জানিয়ে রেখেছেন, রাষ্ট্রপতি যেভাবে একটি সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পাঁচজন কমিশনারকে নিযুক্তি দিয়ে থাকেন এবারও সেভাবেই নিযুক্তি দেবেন। ওই সার্চ কমিটি যাদের নাম প্রস্তাব করবে তাদের সমন্বয়েই নতুন ইসি গঠন করা হবে। এ প্রসঙ্গে সাংবিধানিক নির্দেশনা ও বাধ্যবাধকতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কোনো কোনো মন্ত্রী। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন। ফলে ধরে নেয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতির আড়াল নিয়ে ইসি আসলে ক্ষমতাসীনরাই গঠন করবেন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো বলেছে, যে কোনো সার্চ কমিটিই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে গঠন করতে হবে। সার্চ কমিটিসহ নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবও পেশ করেছেন। গত ১৮ নবেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের যোগ্যতা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, তাকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং সকল বিচারে দল-নিরপেক্ষ সৎ, মেধাবী, দক্ষ, প্রাজ্ঞ, সাহসী এবং নৈতিকতা, ব্যক্তিত্ব ও কর্ম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে। এমন কাউকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিযুক্তি দিতে হবে, যিনি কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন অথবা সরকারের এমন একজন সচিব যিনি অবসর গ্রহণের পর সরকারের কোনো লাভজনক পদে নিয়োজিত নন বা নিয়োজিত ছিলেন না। প্রস্তাবে একজন বিশিষ্ট নাগরিককেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিযুক্তি দেয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, এমন কাউকে পদটিতে নিযুক্তি দেয়া চলবে না, যিনি অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব কিংবা যিনি বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া অবসর গ্রহণ বা পদত্যাগের পর সরকারের লাভজনক কোনো পদে চুক্তিভিত্তিক নিযুক্তিপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকেও পদটিতে নিযুক্তি দেয়া চলবে না। নির্বাচন কমিশনারদের যোগ্যতার ব্যাপারেও একই ধরনের কিছু পূর্বশর্তের কথা তুলে ধরেছেন ২০ দলীয় জোটের নেত্রী। প্রস্তাবে তিনি বাছাই বা সার্চ কমিটি সম্পর্কে বলেছেন, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসমূহ এবং/অথবা স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে এমন সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন নারীসহ পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গঠন করতে হবে। সার্চ কমিটির আহ্বায়ক হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মক্ষম প্রধান বিচারপতি (জ্যেষ্ঠতা অনুসারে), যিনি বিতর্কিত নন এবং অবসর গ্রহণের পর যিনি সরকারের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত নন বা ছিলেন না। মূলকথায় স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রণয়নের জন্যও দাবি জানিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।
ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে ‘অন্তঃসারশূন্য’ বলে অভিহিত করে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা হলেও আমরা মনে করি, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাবগুলো শুধু বাস্তবসম্মত নয়, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এসবের মাধ্যমে সংকটও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা যেহেতু নাকচ করে দিয়েছেন এবং তাদের অনাগ্রহ ও গোপন বিরোধিতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ যেহেতু সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছেন, সেহেতু আমাদের ধারণা,  রাষ্ট্রপতি বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাবগুলোকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। সেটা করা হলে সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি মীমাংসায় পৌঁছানো সহজ হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কেন বিরোধিতা করা হচ্ছে তার কারণ সম্পর্কেও রাষ্ট্রপতি নিশ্চয়ই লক্ষ্য রাখবেন। বিস্তারিত আলোচনার পরিবর্তে এ প্রসঙ্গে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে যে, এই কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনেই জনগণের মতামতের সঠিক প্রতিফলন ঘটতে পারেনি। ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে à§§à§«à§« জনকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা এই কমিশনই দিয়েছিল। তার আগে-পরে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এবং ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের যতোগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেসবের কোনো একটিকেও সুষ্ঠু, গণতন্ত্রসম্মত ও নিরপেক্ষ বলার সুযোগ নেই। প্রতিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ভোট ডাকাতি ও সন্ত্রাস করেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের এলাকা থেকে তাড়িয়ে ছেড়েছে। কিন্তু সব জেনেও কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আপত্তি নিষ্পত্তি করার পদক্ষেপ না নিয়ে কমিশন এমনকি সংবিধান ও আইন লংঘন করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার ফলেই অতি সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পুরো কমিশনকে সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়েছে।
এসব কারণেই বর্তমান নির্বাচন কমিশন জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রমাণিত সত্যটুকু হলো, সংবিধান নির্দেশিত দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে সর্বতোভাবে ক্ষমতাসীনদের আদেশ পালন ও ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়েই কমিশনকে এমন লজ্জাকর পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। একই কারণে এমন একটি কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে, যে কমিশন সকল অর্থেই স্বাধীন হবে এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংবিধানের নির্দেশনা মেনে চলবে। এ ব্যাপারে বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাবগুলো বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে বলে আমরা মনে করি। রাষ্ট্রপতি চাইলে এর বাইরেও বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। তিনি নিজেও কোনো পন্থা বা সমাধান পেশ করতে পারেন। কিন্তু আলোচনার টেবিলে যা কিছুই আসুক না কেন এবং যতো বিতর্কই হোক না কেন, আমরা চাই, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের নেয়া উদ্যোগ যেন নিষ্ফল বা ব্যর্থ না হয়। আমরা বরং আশা করি, বিভিন্ন দলের সঙ্গে অনুষ্ঠেয় পর্যায়ক্রমিক এই সংলাপের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনকেন্দ্রিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান বেরিয়ে আসবে। আমরা আরো আশা করি, নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়েও রাষ্ট্রপতি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন। সব মিলিয়ে তিনি বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে জাতির প্রকৃত অভিবাবকের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবেন বলেই আমরা আশা করতে চাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ